গ্রেটার ইসরায়েল প্রকল্প: ধর্মীয় আদর্শ থেকে উপনিবেশিক সম্প্রসারণ

গ্রেটার ইসরায়েল প্রকল্প:

ধর্মীয় আদর্শ থেকে উপনিবেশিক সম্প্রসারণ

Greater Israel Project
Greater Israel Project


মোঃ রাফি, বিশ্লেষক
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৫

ভূমিকা: একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বপ্ন গ্রেটার ইসরায়েল (এরেৎজ ইসরায়েল হা-শ্লেমা) হল ইহুদি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীদের একটি আদর্শিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য ইসরায়েলের সীমানা প্রসারিত করে ঐতিহাসিক জুডিয়া ও সামেরিয়া (পশ্চিম তীর), গাজা, এমনকি জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ার কিছু অংশ দখল করা (আনুমানিক এলাকা: ৮, বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি)। এই ধারণার গভীরে রয়েছে ইহুদি ধর্মের শেষকালীন বিশ্বাস, যেখানে বলা হয়েছে "প্রতিশ্রুত ভূমি" পুনর্দখল করাই মসিহার আগমনের পথ প্রশস্ত করবে।

১৯৪৮ সালে ধর্মনিরপেক্ষ সিয়োনিস্ট নীতির ভিত্তিতে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর থেকে ধর্মীয় সিয়োনিজমের উত্থান এই ধারণাকে একটি রাষ্ট্রীয় সমর্থিত উপনিবেশিক প্রকল্পে পরিণত করেছে। এর ফলাফল হয়েছে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ, ধীরে ধীরে ভূমি দখল এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট।

১. উৎপত্তি:
বাইবেলীয় প্রতিশ্রুতি থেকে আধুনিক জাতীয়তাবাদ ইহুদিদের "ইসরায়েল ভূমিতে" ফিরে আসার ধারণার উৎস হিব্রু ধর্মগ্রন্থে (জেনেসিস ১৫:১৮-২১, নাম্বার্স ৩৪), যেখানে ঈশ্বর আব্রাহামকে নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত ভূমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে এর আধুনিক রাজনৈতিক সংস্করণ দুটি পর্যায়ে বিকশিত হয়েছে:

বিংশ শতাব্দীর শুরু: বিকল্প আবাসভূমির বিতর্ক
ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার আগে, জায়োনিস্ট নেতারা বিতর্ক করেছিলেন ইহুদি রাষ্ট্র কোথায় প্রতিষ্ঠা করা উচিত। থিওডোর হার্জল প্রাথমিকভাবে আর্জেন্টিনাকে (জনশূন্যতা ও সম্পদের জন্য) প্রস্তাব করেছিলেন, এমনকি উগান্ডাকেও বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু ধর্মীয় জায়োনিস্ট আন্দোলন জোর দিয়েছিল যে শুধুমাত্র ফিলিস্তিনই বাইবেল অনুযায়ী ইহুদিদের ভূমি। ব্যালফোর ঘোষণা (১৯১৭) ও ব্রিটিশ ম্যান্ডেট এই দিকনির্দেশনা চূড়ান্ত করে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ও ১৯৬৭ সালের পরিবর্তন:
হলোকস্টের পর জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা (১৯৪৭) ইসরায়েলের জন্ম দেয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ—যেখানে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা, সিনাই ও গোলান মালভূমি দখল করে—ধর্মীয় জায়োনিস্টদের কাছে একটি ঐশ্বরিক সংকেত হিসেবে দেখা দিল যে বাইবেল বর্ণিত ভূমি পুনর্দখল করতে হবে। গুশ এমুনিম (বিশ্বাসীদের ব্লক) এর মতো গোষ্ঠীগুলি বসতি স্থাপন আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়, যাকে তারা একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে প্রচার করে।

২. প্রকল্পের মূল চালিকাশক্তি:
গ্রেটার ইসরায়েল এজেন্ডা এগিয়ে নিচ্ছে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির একটি জোট: পশ্চিম তীরে এখন ৭ লক্ষাধিক ইহুদি বসতি স্থাপনকারী বাস করছে, যাদেরকে ইসরায়েলি সরকার সমর্থন করে। ইয়েশা কাউন্সিল এর মতো সংগঠনগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমি দখলের পক্ষে লবিং করে। জিউশ হোম পার্টি, অতজমা ইহুদিত এবং বেজালেল স্মোত্রিচের মতো নেতারা প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণের ডাক দেন। টেম্পল মুভমেন্ট এর মতো মেসিয়ানিক গোষ্ঠীগুলি সক্রিয়ভাবে আল-আকসা মসজিদের ধ্বংসস্তূপে তৃতীয় ইহুদি মন্দির পুনঃনির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাকে তারা মসিহা আসার পূর্বশর্ত মনে করে।

৩. শেষকালীন লক্ষ্য:
ধর্মীয় রাজনীতির মিশন চরমপন্থীদের জন্য ভূমি দখল কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়—এটি একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা: তৃতীয় মন্দির নির্মাণকে র‍্যাডিক্যালরা ইহুদি মুক্তির অপরিহার্য শর্ত মনে করে। ইরান, হিজবুল্লাহ বা হামাসের সঙ্গে সংঘর্ষকে কেউ কেউ বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী (এজেকিয়েল ৩৮-৩৯) হিসেবে ব্যাখ্যা করে যা "শেষ যুগের" সূচনা করবে। ধর্মীয় গ্রন্থের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের ধীরে ধীরে উচ্ছেদকে "অনৈসলামিক বাসিন্দাদের" অপসারণের ডিভাইন আদেশ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়া হয়।

৪. ভূরাজনৈতিক প্রভাব: দখল, অন্তর্ভুক্তি ও অস্থিতিশীলতা
ইহুদি বসতি ও জমি দখল ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনকে ভৌগোলিকভাবে অসম্ভব করে তুলেছে। আমেরিকার নির্বিচার সমর্থন (যেমন জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তর, জাতিসংঘের ভেটো) ইসরায়েলের সম্প্রসারণকে সম্ভব করছে। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে আরব রাষ্ট্রগুলি অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলে ইসরায়েল ফিলিস্তিন ইস্যুকে প্রান্তিক করতে পেরেছে, একই সাথে ভূমি দখল জোরদার করেছে। গ্রেটার ইসরায়েল পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে তা হবে ফিলিস্তিনের চূড়ান্ত অবলুপ্তি, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াবে।

ধর্ম ও সম্প্রসারণবাদের বিপজ্জনক মিশ্রণ গ্রেটার ইসরায়েল প্রকল্প কেবল একটি জাতীয়তাবাদী প্রচেষ্টা নয়—এটি একটি ধর্মীয় ক্রুসেড যা উপনিবেশিক ভূমি দখলকে অ্যাপোক্যালিপ্টিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যদিও কিছু ইসরায়েলি এই চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করেন, কিন্তু সরকারে এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব সংঘাতকে অবধারিত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ধর্মের ছদ্মাবরণে বর্ণবাদ ও জাতিগত শুদ্ধিকে স্বাভাবিক করে তুলছে। জরুরি হস্তক্ষেপ ছাড়া, এই আদর্শ সহিংসতাকে আরও উসকে দেবে, ফিলিস্তিনিদেরকে অধিকার ও মাতৃভূমি উভয়ই থেকে বঞ্চিত করবে।

Comments