বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির পরিকল্পনা চীনের: অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির পরিকল্পনা চীনের:
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব
মোঃ রাফি, বিশ্লেষক
প্রকাশ: ১ মার্চ ২০২৫
চীন যখন বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির ঘোষণা দেয়, তখন এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সূচনা হতে পারে—কারণ ইলিশ শুধু মাছ নয়, এটি বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি এবং কূটনীতির প্রতীক, যাকে প্রায়ই "রাজনৈতিক মাছ" বা "কূটনৈতিক মাছ" হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশ বিশ্বের ইলিশ উৎপাদনের ৭০-৭৫% নিয়ন্ত্রণ করে, বছরে ৫.৫ লাখ মেট্রিক টন, যা দেশের জিডিপির ১% এবং ২৫ লাখ মৎস্যজীবীর জীবিকার মূল ভিত্তি; এই মাছ ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক মেরামতের হাতিয়ার হয়েছে, যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং পতিত স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা দুর্গাপূজায় ইলিশ উপহার পাঠিয়েছে। এখন চীন, যার ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে সামুদ্রিক খাদ্যের চাহিদা বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, এই ইলিশের স্বাদ গ্রহণ করতে চায়—একটি চুক্তি যা বছরে ১০ হাজার মেট্রিক টন রপ্তানি করে ১০০-২০০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ চীনে মাত্র ১.০২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যেখানে আমদানি ছিল ২২.৯ বিলিয়ন ডলার—ইলিশ এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে বাংলাদেশের আলোচনার শক্তি বাড়াতে পারে। এর বাইরে, চীনের এই পদক্ষেপ জাপান (১৫০ বিলিয়ন ডলারের সামুদ্রিক বাজার), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (২৮০ বিলিয়ন ডলার), মধ্যপ্রাচ্য (২০ বিলিয়ন ডলার) এবং যুক্তরাষ্ট্রের (৩০০ বিলিয়ন ডলার) মতো বাজারের জন্য দরজা খুলে দেয়, যেখানে ইলিশের প্রিমিয়াম দাম—কেজি প্রতি ১০-২০ ডলার—দশকের মধ্যে মৎস্য রপ্তানিকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পারে। এই একটি চুক্তি বাংলাদেশের পোশাকনির্ভর অর্থনীতি (২০২৩ সালে রপ্তানির ৮৫%) থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখাতে পারে, ১০০,০০০-১৫০,০০০ নতুন চাকরি সৃষ্টি করতে পারে এবং চাঁদপুর, বরিশালের মতো অঞ্চলে গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে। তবে, এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে টেকসই মৎস্যচাষ, আধুনিক শীতল সংরক্ষণাগার, এবং চট্টগ্রাম বন্দরের মতো রপ্তানি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ অপরিহার্য—নইলে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপে ইলিশের মজুদ বিপন্ন হতে পারে। চীনের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে ৪.৪৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের সুবাদে এই অবকাঠামো সম্ভব, কিন্তু ইলিশের রাজনৈতিক মাত্রা এখানেও কাজ করবে—এটি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বাংলাদেশের জাতীয় গর্ব এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার। এই চুক্তি সফল হলে, ইলিশ কেবল প্লেটে নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের দাবার ছকে বাংলাদেশের রাজা হয়ে উঠতে পারে।
Comments
Post a Comment