রোহিঙ্গা সংকটের সমাপ্তি: ড. ইউনূসের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি

রোহিঙ্গা সংকটের সমাপ্তি:

ড. ইউনূসের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি

রোহিঙ্গা সংকটের সমাপ্তি: ড. ইউনূসের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি
রোহিঙ্গা সংকটের সমাপ্তি

মোঃ রাফি, বিশ্লেষক
প্রকাশ:  মার্চ ২০২৫

১৪ মার্চ, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উপস্থিতিতে একটি অভূতপূর্ব ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের মধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে তাদের জন্মভূমি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতি ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের গণহারে বাংলাদেশে প্রবেশের পর থেকে যে কোনো সরকারি নেতার পক্ষ থেকে সবচেয়ে সাহসী এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। গুতেরেসের চার দিনের সফরে এই ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এই বিশাল শরণার্থী জনগোষ্ঠীর বোঝায় জর্জরিত। এটি কি সত্যিই একটি ঐতিহাসিক মোড়, নাকি দীর্ঘস্থায়ী হতাশার আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা?

ঐতিহাসিক পটভূমি: নিপীড়নের শিকড় ও নির্বাসনের যাত্রা
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেখানে বসবাস করে আসছে। কিন্তু ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়, তাদেরকে রাষ্ট্রহীন করে ফেলে। এই আইনের ফলে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও চাকরির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, এবং একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অধীনে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। ১৯৯১-৯২ সালে প্রথম বড় ধরনের স্থানচ্যুতি ঘটে, যখন প্রায় ২.৫ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ২০১২ সালে রাখাইনে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর আরেকটি ঢেউ আসে, কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) নামে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলার জবাবে সেনাবাহিনী গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, নারী-শিশুদের উপর নৃশংসতা চালায় এবং প্রায় ৭.৫ লক্ষ মানুষকে বাংলাদেশে পালাতে বাধ্য করে। জাতিসংঘ এটিকে ‘জাতিগত নিধনের একটি পাঠ্যবই উদাহরণ’ হিসেবে অভিহিত করে।
বাংলাদেশ, যার জনসংখ্যার ঘনত্ব বিশ্বের সর্বোচ্চ (প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,২৬৫ জন), মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দেয়। কক্সবাজারের কুতুপালং ও বালুখালি শিবিরে দ্রুতই ১০ লক্ষের বেশি মানুষ আশ্রয় নেয়, যা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়। প্রথমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে আসে—যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইউ) এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলো তহবিল দেয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহ কমে যায়, আর বাংলাদেশ একা এই বিশাল দায়িত্ব বহন করতে থাকে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: পরিসংখ্যানে একটি ভারী বোঝা
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া একটি অর্থনৈতিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, দেশটির জিডিপি প্রতি মাথাপিছু ছিল মাত্র $২,৮৪৬, এবং ২০২৪ সালে মোট জিডিপি $৪৪৬ বিলিয়ন (আইএমএফ অনুমান)। এই প্রেক্ষাপটে, ১.২ মিলিয়ন শরণার্থীকে ধারণ করা অসম্ভব চাপ সৃষ্টি করেছে। ইউএনএইচসিআর-এর মার্চ ২০২৫-এর হিসাবে, শিবিরে বছরে ৩০,০০০ শিশুর জন্ম হচ্ছে, যা জনসংখ্যার চাপ আরও বাড়াচ্ছে।
২০২২ সালে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ প্রতিবেদন অনুসারে, রোহিঙ্গাদের খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার জন্য বছরে $১.২১ বিলিয়ন খরচ হয়। ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতি ও সাহায্য হ্রাসের কারণে এই পরিমাণ $১.৩ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যা জিডিপির প্রায় ৩%। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জন্য $৮১ মিলিয়ন প্রয়োজন, যার মধ্যে এপ্রিলের জন্যই $১৫ মিলিয়ন। কিন্তু তহবিল কমে যাওয়ায় প্রতি মাথার রেশন $১২.৫০ থেকে $৬-এ নামতে পারে। ইউনিসেফ-এর তথ্যমতে, ২০২৪-এর ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গুরুতর অপুষ্টির ঘটনা ২৭% বেড়েছে (৮৩৬ থেকে ১,০৬২)।
স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব আরও গভীর। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কক্সবাজারে দিনমজুরদের মজুরি ৩০% কমেছে, কারণ রোহিঙ্গারা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কম মূল্যে কাজ করছে। শিবির নির্মাণে ৬,০০০ একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে, যার পরিবেশগত ক্ষতি $১৩৫ মিলিয়ন (বিশ্বব্যাংক, ২০২০)। কক্সবাজারের পর্যটন, যা একসময় অঞ্চলের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিল, ২০১৭ সালের পর ৪০% হ্রাস পেয়েছে। সমুদ্র সৈকতের জায়গায় এখন শরণার্থী শিবিরের দৃশ্যই প্রাধান্য পায়।

অতীতের নিষ্ক্রিয়তা: হতাশার সাত বছর
২০১৭ সালের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন আলোচনা শুরু হলেও ফলাফল শূন্য। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুটি প্রচেষ্টায় মাত্র ৩০০ জন ফিরতে রাজি হয়, কারণ মিয়ানমারে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছিল না। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উঠলেও সামরিক জান্তা কোনো সহযোগিতা করেনি। ২০২০ সালে হাসিনা ১ লক্ষ রোহিঙ্গাকে ভাসানচর দ্বীপে সরান, যা বিতর্কিত হলেও কক্সবাজারের চাপ কিছুটা কমায়। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান ছিল না।
আন্তর্জাতিক সাহায্যও কমতে থাকে। ইউএন ওসিএইচএ-র তথ্যমতে, ২০১৭ সালে $৯৭৪ মিলিয়ন থেকে ২০২৩ সালে তা $৬৭৫ মিলিয়নে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ সালে $৩০০ মিলিয়ন দিয়ে বড় দাতা থাকলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইউএসএআইডি-এর কার্যক্রম বন্ধের আশঙ্কায় ২০২৫ সালে সাহায্য ৫০% কমতে পারে। এদিকে, ইউক্রেন ও গাজার মতো সংকটে বিশ্বের দৃষ্টি সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গারা ভুলে যাওয়া একটি জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

আরাকান আর্মি ও রাখাইনের নতুন গতিপথ
২০২৫ সালে রাখাইনে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলেছে। আরাকান আর্মি, একটি বৌদ্ধ রাখাইন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী, মিয়ানমার জান্তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাখাইনের বড় অংশ দখল করেছে। ২০২৪ সালের শেষ থেকে তারা সীমান্তবর্তী মংডু ও বুথিডং শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়। এই উত্থান রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা এবং জটিলতা উভয়ই তৈরি করেছে। আরাকান আর্মি জান্তার চেয়ে কম শত্রুভাবাপন্ন হলেও, তাদের লক্ষ্য রাখাইন জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন নয়। তবু, জান্তার দুর্বলতা প্রত্যাবাসনের জন্য একটি জানালা খুলতে পারে, যদি নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন সমাধান করা যায়।

ইউনূস-গুতেরেস জোট: একটি নতুন অধ্যায়
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর সেপ্টেম্বরে ক্ষমতায় আসেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারক। তিনি রোহিঙ্গা সংকটকে অগ্রাধিকার দেন এবং গুতেরেসের সফরকে এর জন্য একটি মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৪ মার্চ তিনি ও গুতেরেস কক্সবাজারে ১ লক্ষ রোহিঙ্গার সঙ্গে রমজানের ইফতারে যোগ দেন—একটি প্রতীকী পদক্ষেপ যা বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ঢাকায় গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠকে ইউনূস ঈদ ২০২৬-এর সময়সীমা ঘোষণা করেন। গুতেরেস জাতিসংঘের পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন, মিয়ানমারে বিশেষ দূত ও এশিয়ানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন।
এই পদক্ষেপ অতীতের থেকে আলাদা কারণ এটি শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউনূসের বিশ্বব্যাপী খ্যাতি ও অর্থনৈতিক দক্ষতা এটিকে একটি বাস্তব সম্ভাবনায় রূপ দেয়। গুতেরেস ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ ইউনূসকে চিঠি দিয়ে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছিলেন, যা এই সফরে মূর্ত হয়েছে।

কেন এটি অভূতপূর্ণ?
২০১৭ সালের পর কোনো বাংলাদেশি নেতা এমন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা জাতিসংঘের এই মাত্রার সমর্থন আদায় করতে পারেননি। হাসিনার আমলে প্রাথমিক মানবিকতা প্রশংসিত হলেও, কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও জনগণের ক্ষোভ বেড়েছে। ইউনূসের প্রতিশ্রুতি $১.৩ বিলিয়ন বার্ষিক বোঝা থেকে মুক্তি দিতে পারে, যা বাংলাদেশকে উন্নয়নে ফিরিয়ে আনবে। তবে চ্যালেঞ্জ বিশাল—মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, আরাকান আর্মির অনিশ্চিত ভূমিকা, এবং জাতিসংঘের অতীত ব্যর্থতা।
১৭ কোটি মানুষের এই দেশটি আর কতদিন এই বোঝা বইবে? ঈদ ২০২৬ কি রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার গল্প লিখবে, নাকি বাংলাদেশের ধৈর্যের আরেকটি পরীক্ষা হবে—সময়ই বলবে।

Comments