হিন্দুত্বের সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শ এবং ভারতে মুসলিম বিদ্বেষ

হিন্দুত্বের সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শ এবং ভারতে মুসলিম বিদ্বেষ

Citizens shout slogans and hold placards during a peace vigil organized by citizens against hate crimes and violence against Muslims, New Delhi, India, April 16, 2022. (Reuters Photo)
Citizens shout slogans and hold placards during a peace vigil organized by citizens against hate crimes and violence against Muslims, New Delhi, India, April 16, 2022. (Reuters Photo)


মোঃ রাফি, বিশ্লেষক
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৫

টিআরটি ওয়ার্ল্ডের সূত্র অনুসারে (আগস্ট ২৮, ২০১৯ থেকে আগস্ট ২৭, ২০২১ পর্যন্ত করা জরিপে), ভারতে সামাজিক মাধ্যমে ইসলামোফোবিয়ার বৃহত্তম অবদানকারী। বর্তমানে ভারতীয়রা ইজরায়েলের প্রতি সমর্থন জানানোর কারণ হিসেবে ৭ অক্টোবর, ২০২৩-এ হামাসের হামলার ঘটনা তুলে ধরে। তবে, সেই ঘটনার বহুকাল আগ থেকেই তারা অনলাইনে ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানোতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

ইসলামিক কাউন্সিল অফ ভিক্টোরিয়া (আইসিভি) কর্তৃক প্রকাশিত "ডিজিটাল যুগে ইসলামোফোবিয়া" শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ভারতে বিশ্বব্যাপী টুইটার ব্যবহারকারীর মাত্র ৫.৭৫% রয়েছে, কিন্তু দেশটি সমস্ত ইসলামবিরোধী টুইটের ৫৫% এর জন্য দায়ী। প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ভারত তিন বছরের সময়কালে টুইটারে ৮৫% ইসলামবিরোধী সামগ্রী সরবরাহ করেছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে যথেষ্ট সংখ্যক ভারতীয় প্রবাসী রয়েছে যারা বিদ্বেষপূর্ণ হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শে সংক্রমিত।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চ-পর্যায়ের অনুষ্ঠানে বলেন, সারাবিশ্বে মুসলমানরা যে ক্রমবর্ধমান ঘৃণার শিকার হচ্ছেন তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তিনি বলেন, "এটি জাতিগত জাতীয়তাবাদ, নব্য-নাৎসি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী মতাদর্শ এবং মুসলমান, ইহুদি, কিছু সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং অন্যান্য দুর্বল জনগোষ্ঠীর উপর সহিংসতার পুনরুত্থানের একটি অনিবার্য অংশ।"
হিন্দুত্বের সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শ এবং ভারতে মুসলিম বিদ্বেষ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ
হিন্দুত্ব একটি উগ্রবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ যা হিন্দু জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক ন্যায্যতা এবং ভারতে হিন্দু আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসকে ধারণ করে। ১৯২২ সালে বিনায়ক দামোদর সাভারকর সবার প্রথমে এই রাজনৈতিক মতাদর্শটি প্রণয়ন করেন। সময়ের সাথে সাথে, এই মতাদর্শটি একটি উগ্র, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী এবং মুসলিম বিরোধী রূপ নিয়েছে।

হিন্দুত্বের সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শে রূপান্তরিত হওয়ার কারণ
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। দেশভাগের আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা এবং ভারত-পাকিস্তান শত্রুতা হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ আরও বাড়িয়ে তোলে। তারা মুসলিমদের বহিরাগত এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে।

সাংস্কৃতিক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা:
হিন্দুত্ববাদীরা ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে হিন্দু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রধান হবে এবং সংখ্যালঘুদের গৌণ ভূমিকা থাকবে। এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকেই মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের জন্ম নেয়।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য:
রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ও কার্যকলাপ প্রচার করে। মেরুকরণের রাজনীতি তাদের নির্বাচনে সুবিধা এনে দেয়।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) ভূমিকা:
RSS একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী আধা-সামরিক সংগঠন যা হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রধান প্রচারক। এই সংগঠনের শাখা-প্রশাখা এবং বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন সমাজের সর্বস্তরে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ফ্যাসিবাদী প্রভাব:
হিন্দুত্ব আন্দোলনের উপর ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের প্রভাব দেখা যায়। তারা একটি সমজাতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণা পোষণ করে এবং সংখ্যালঘুদের প্রান্তিক করার চেষ্টা করে।

ভারতে মুসলিম বিদ্বেষ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ:

  • বাবরি মসজিদ ধ্বংস (১৯৯২): অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এই ঘটনাটি দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করে এবং হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ আরও বাড়িয়ে তোলে।
  • গুজরাট দাঙ্গা (২০০২): গুজরাটে ব্যাপক মুসলিম বিরোধী সহিংসতা হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের একটি ভয়াবহ রূপ দেখায়। এই দাঙ্গায় বহু মুসলিম নিহত ও বাস্তুচ্যুত হন।
  • লাভ জিহাদ ও গো-রক্ষার নামে সহিংসতা (২০০০-বর্তমান): "লাভ জিহাদ" (মুসলিম ছেলেরা হিন্দু মেয়েদের ধর্মান্তরিত করার ষড়যন্ত্র) এবং গো-রক্ষার নামে মুসলিমদের উপর হামলা ও হত্যা হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর নিয়মিত কার্যকলাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
  • কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল (২০১৯): ভারত সরকার কর্তৃক জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং রাজ্যটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত সেখানকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এই পদক্ষেপের আগে ও পরে দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর অবরোধ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
  • বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন (CAA) ও জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) নিয়ে প্রতিবাদ (২০১৯-২০২০): এই আইনগুলো মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক বলে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। CAA-তে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিধান রয়েছে, যেখানে মুসলিমদের বাদ রাখা হয়েছে। NRC-র বাস্তবায়ন বহু মুসলিমকে নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে ফেলে বলে আশঙ্কা করা হয়। দেশব্যাপী এই প্রতিবাদ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
  • কর্ণাটকে হিজাব বিতর্ক (২০২২): কর্ণাটকের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, যা মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে সমালোচিত হয়। আদালত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখায় মুসলিম ছাত্রীরা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েন।
  • বুলডোজার নীতি (২০২২-বর্তমান): বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিনা নোটিশে বা স্বল্প নোটিশে ভেঙে ফেলার ঘটনা বেড়েছে। এটিকে মুসলিমদের শাস্তি দেওয়ার এবং ভয় দেখানোর একটি রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে দেখা হয়। আইন ও ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
  • ওয়াকফ বিলের সাম্প্রতিক সংশোধন (২০২৫): ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনা সংক্রান্ত এই বিলটি মুসলিমদের ধর্মীয় ও দাতব্য সম্পত্তির উপর তাদের অধিকারকে দুর্বল করে। বোর্ডের গঠনে পরিবর্তন, কালেক্টরের হাতে মালিকানা নির্ধারণের ক্ষমতা এবং তামাদি আইনের প্রয়োগের ফলে ওয়াকফ সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় বিদ্বেষপূর্ণ প্রচার (২০১৪-বর্তমান): সোশ্যাল মিডিয়ায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে লাগাতার বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য, ভুয়া খবর এবং ঘৃণা ছড়ানো হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রধান হাতিয়ার। এই অনলাইন বিদ্বেষ প্রায়শই বাস্তব জীবনে সহিংসতার ইন্ধন যোগায় এবং মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা গেছে, ভারত সামাজিক মাধ্যমে ইসলামোফোবিয়ার অন্যতম প্রধান উৎস।

এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে হিন্দুত্ব একটি ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শে পরিণত হয়েছে যা ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সহিংসতা উস্কে দিচ্ছে। এই বিদ্বেষপূর্ণ পরিবেশ কেবল মুসলিমদের জীবনকেই দুর্বিষহ করে তুলেছে, পাশাপাশি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির জন্যও একটি বড় হুমকি।

Comments