ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির অবস্থান: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে সাম্প্রতিক উন্নয়ন

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির অবস্থান:

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে সাম্প্রতিক উন্নয়ন

President Donald Trump to Recognize Palestine
President Donald Trump to Recognize Palestine



মোঃ রাফি, বিশ্লেষক
প্রকাশ: ১৩ মে, ২০২৫

২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির সম্ভাব্য উদ্যোগ মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে একটি নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তার প্রথম মেয়াদে ইসরায়েলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের পর এই পদক্ষেপ অপ্রত্যাশিত হলেও, সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক চাপ এই বিবেচনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই বিশ্লেষণে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জায়নবাদের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ইসরায়েল-বিরোধী দেশগুলোর সাথে উত্তেজনা এবং ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের পেছনের সাম্প্রতিক কারণগুলো পরীক্ষা করবো।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জায়নবাদ এবং ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা
জায়নবাদ, উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপে উদ্ভূত একটি ইহুদি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠে। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকারের বেলফোর ঘোষণা এই আন্দোলনকে বৈধতা দেয়, কিন্তু স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর অধিকারকে উপেক্ষা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হলোকাস্টের ভয়াবহতা ইহুদিদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান প্রথমদের মধ্যে এটি স্বীকৃতি দেন, যা মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে। শীতল যুদ্ধের সময় ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত প্রভাবের বিরুদ্ধে মার্কিন স্বার্থের একটি কৌশলগত মিত্র হয়ে ওঠে। ১৯৯৫ সালে জেরুজালেম দূতাবাস আইন পাস হলেও, জাতীয় নিরাপত্তার কারণে বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। ট্রাম্প ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দূতাবাস স্থানান্তর করেন, যা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জন্মায়। এই ঐতিহাসিক সমর্থন ফিলিস্তিনি আকাঙ্ক্ষাকে প্রান্তিক করে, ১৯৪৮ সালের নাকবায় ৭৫০,০০০ ফিলিস্তিনি উচ্ছেদ হয় এবং ইসরায়েল ৭৮ শতাংশ ফিলিস্তিনী ভূমি দখল করে।

ইসরায়েল-বিরোধী দেশগুলোর সাথে মার্কিন উত্তেজনার বৃদ্ধি
ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কয়েকটি দেশের সাথে উত্তেজনা সৃষ্টি করে, বিশেষ করে ইরানের সাথে, যারা ইসরায়েলকে দখলদার শক্তি হিসেবে দেখে। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর ইরান মার্কিন-বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইরানের সমর্থিত এই গোষ্ঠীগুলো সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরাকের মতো অঞ্চলে প্রক্সি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে প্রত্যাহার ইরানকে তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ত্বরান্বিত করতে উৎসাহিত করে, যা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ায়। সৌদি আরব, যদিও মার্কিন মিত্র, ইরানের সাথে প্রক্সি সংঘাতে জড়িত থাকলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে দ্বৈত ভূমিকা পালন করে। ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, যা ইরানের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত অবস্থানের অংশ হলেও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি তৈরি করে। কাতার এই সময়ে হামাসের আর্থিক সমর্থক হিসেবে উঠে আসে, গাজায় মানবিক সাহায্য প্রদান করে এবং মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে।

ট্রাম্পের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির বিবেচনা: সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট
ট্রাম্পের ২০২৫ সালে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির সম্ভাব্য উদ্যোগ বেশ কয়েকটি জটিল কারণের দ্বারা প্রভাবিত। প্রথমত, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মার্কিন ও সৌদি-নেতৃত্বাধীন সংঘাতের অর্থনৈতিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর হুথিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর আক্রমণ শুরু করে, যা মার্কিন ও সৌদি সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ২০২৫ সালের মার্চে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা মার্কিন সামরিক ব্যয় কমায়, তবে হুথিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করে। এই সংঘাতের ব্যয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে তার জড়িততা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে।
দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রস্তাব এই উদ্যোগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দেয়, যা মার্কিন অর্থনীতিতে অবকাঠামো ও শক্তি খাতে সহায়তা করবে। এই প্রস্তাব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সাথে যুক্ত, এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতি এই লক্ষ্য অর্জনে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। কাতার, হামাসের একটি প্রধান সমর্থক, গাজায় মানবিক সাহায্যের জন্য শতকোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দেয়, যা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করতে পারে এবং ইরানের প্রভাব কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, মিশর ও জর্ডানের মতো ফিলিস্তিনের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের এই আলোচনা থেকে বাদ দেওয়া উপসাগরীয় কূটনীতিকদের মধ্যে সন্দেহ জাগিয়েছে।
তৃতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক উন্নয়ন এবং হামাসের সাথে সম্পর্ক এই প্রেক্ষাপট জটিল করে। ২০২৪ সালে ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে অস্ত্র-গ্রেডের কাছাকাছি নিয়ে যায়, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ায়। ইরান বছরে ১৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে হামাসকে সমর্থন করে, যা ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের উপর হামলায় ভূমিকা রাখে। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত স্বীকৃতি হামাসকে বাদ দিয়ে করা হবে, যা ইরানের প্রভাব কমানোর একটি কৌশল, তবে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভক্তি সৃষ্টি করতে পারে।
চতুর্থত, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতন্যাহুর তীব্র বিরোধিতা এই উদ্যোগের পথে একটি বড় বাধা। নেতন্যাহু ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতিকে একটি ‘ঐতিহাসিক ভুল’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন যে এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তিনি দুই-রাষ্ট্র সমাধান প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং গাজায় চলমান সংঘাতের মধ্যে এই অবস্থান আরও কঠোর করেছেন। এই বিরোধিতা ট্রাম্পের উদ্যোগকে জটিল করে, বিশেষ করে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রো-ইসরায়েল লবি গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব উল্লেখযোগ্য।
পঞ্চমত, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং প্রক্সি সংঘাতের অর্থনৈতিক ব্যয় ট্রাম্পকে এই উদ্যোগের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সিরিয়া ও ইরাকে প্রক্সি যুদ্ধে মার্কিন তহবিল, সৌদি আরব ও ইসরায়েলকে বার্ষিক সামরিক সাহায্য বিলিয়ন ডলারের বোঝা সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এই ব্যয় হ্রাস করতে চায়, এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতি এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শেষ কথা: একটি জটিল কিন্তু সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ
ট্রাম্পের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির সম্ভাব্য উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, তবে এটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ইয়েমেনে শান্তি চুক্তি, সৌদি ও কাতারের অর্থনৈতিক প্রস্তাব, এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ব্যয় হ্রাসের প্রয়োজনীয়তা এই পদক্ষেপের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে, নেতন্যাহুর তীব্র বিরোধিতা, হামাসের বাদ দেওয়া, এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ এই উদ্যোগের সফলতাকে অনিশ্চিত করে। ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে একটি শক্তিশালী জোট বজায় রেখেছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা একটি প্র্যাগম্যাটিক পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে। তবে, এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিনি জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। সত্যিকারের শান্তি কেবল কূটনৈতিক ঘোষণার মাধ্যমে নয়, বরং ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

Comments