ইরানের পারমাণবিক আলোচনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
ইরানের পারমাণবিক আলোচনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র
![]() |
| U.S.-Iran Nuclear Deal Involving Israel |
মোঃ রাফি, বিশ্লেষক
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৫
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক আলোচনা গত কয়েক সপ্তাহে একটি নতুন মোড় নিয়েছে। ২৩ মে, ২০২৫ তারিখে রোমে পঞ্চম দফার আলোচনার সময় ইসরায়েলের কৌশলগত বিষয়ক মন্ত্রী রন ডারমার এবং মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সমন্বয় করা এবং ইরানের সঙ্গে চলমান পারমাণবিক আলোচনার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান। এই ঘটনা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে ইসরায়েলের সরাসরি ও গভীর প্রভাবের একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ। আজ, ২৭ মে, ২০২৫-এ এই বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে, যখন ইরানের পক্ষ থেকে নতুন হুমকি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় যৌথ পরিকল্পনা চুক্তি (জেসিপিওএ) স্বাক্ষরিত হয়, যা ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিনিময়ে তার ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে সরে আসেন এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যা ইরানের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি আবার কূটনৈতিক পথে ফিরে আসেন, যদিও এই প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট।
ইসরায়েল সবসময়ই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজের জন্য একটি অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে। সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়েছিল যে ইসরায়েল এই বছরের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ইসরায়েলের যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন, বিশেষ করে মাঝ আকাশে জ্বালানি সরবরাহ এবং গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার জন্য উন্নত বোমার ক্ষেত্রে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই মুহূর্তে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেছে, যদি না ইরানের পক্ষ থেকে কোনো বড় ধরনের উসকানি দেওয়া হয়।
রোমে আলোচনা: ইসরায়েলের প্রভাব ও কৌশল
২৩ মে রোমে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি ইসরায়েলের কৌশলগত প্রভাবের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। এর আগে এপ্রিল মাসে প্যারিসে একটি গোপন বৈঠক হয়েছিল, যেখানে একই ইসরায়েলি কর্মকর্তারা উইটকফের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন। এই বৈঠকগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে সরাসরি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প একটি ফোনালাপে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে তাদের একক লক্ষ্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ইসরায়েলের অবস্থান স্পষ্ট: তারা চায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ হোক এবং পারমাণবিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলা হোক।
ইরানের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক হুমকি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২২ মে অ্যাক্সিওস-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান হুমকি দিয়েছে যে তারা তাদের পারমাণবিক উপকরণ অপ্রকাশিত স্থানে সরিয়ে নিতে পারে, যাতে ইসরায়েলি হামলা থেকে সেগুলো রক্ষা করা যায়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, “ইসরায়েলি হামলার হুমকি অব্যাহত থাকলে আমাদের পারমাণবিক স্থাপনা ও উপকরণ রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।” এই পদক্ষেপ ইরানের পারমাণবিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণকে আরও কঠিন করে তুলবে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও ট্রাম্পের কৌশল
ট্রাম্প প্রশাসন এই ইস্যুতে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে দিয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন, যা ইরানের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক পথে ফিরে আসেন। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসের শুরুতে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে অবাক করে দিয়ে ইরানের সঙ্গে তাৎক্ষণিক আলোচনার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এই আলোচনার সাফল্য নির্ভর করছে কয়েকটি মূল শর্তের ওপর, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বন্ধ করা এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা টাইমস অব ইসরায়েলকে জানিয়েছেন, “রোমে আমাদের দ্বিতীয় দফার আলোচনায় চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। আমরা পরের সপ্তাহে আবার বৈঠক করতে সম্মত হয়েছি এবং ওমান ও ইতালির অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞ।” তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উপদেষ্টা আলী শামখানি আলোচনার আগে বলেছেন, ইরান কখনোই তার সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করবে না এবং বিদেশে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহারের মডেল (যেমন লিবিয়া বা সংযুক্ত আরব আমিরাত) মেনে নেবে না।
ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ ও আঞ্চলিক প্রভাব
ইরানের জন্য এই আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানের কাছে কোনো শক্তিশালী বিকল্প পরিকল্পনা নেই। চীন ও রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাও কম, কারণ এই দুই দেশ নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক সমস্যায় জড়িয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান হয়তো তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে আরও গোপনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
২৭ মে পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ইরানের সাম্প্রতিক হুমকি এবং ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি একটি সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি সম্প্রতি মস্কো সফরে গিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে ইরান আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করার চেষ্টা করছে। তবে রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে থাকায় এই সমর্থন কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
আঞ্চলিক ও বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব
ইরানের পারমাণবিক আলোচনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বিশ্ব রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে একটি নতুন সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে, যা তেলের বৈশ্বিক বাজার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি ইরানকে আরও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলের প্রতি অন্ধ সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যে তার নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করছে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের প্রস্তুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় এই অঞ্চলে একটি নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখনও কূটনীতির ওপর জোর দিচ্ছে, যা আশার আলো দেখাচ্ছে।
ইরানের পারমাণবিক আলোচনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক একটি জটিল গতিশীলতার প্রতিফলন। ইসরায়েলের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে স্পষ্ট হলেও, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক পথে এগোতে চায়। কিন্তু ইরানের সাম্প্রতিক হুমকি এবং ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি পরিস্থিতিকে একটি বিপজ্জনক মোড়ে নিয়ে গেছে। ২৭ মে, ২০২৫ পর্যন্ত এই আলোচনার ফলাফল এখনও অনিশ্চিত, তবে এর ফলাফল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষে এই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আনা এবং একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।

Comments
Post a Comment