ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান: একটি গোপন ষড়যন্ত্রের আড়ালে
ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান:
একটি গোপন ষড়যন্ত্রের আড়ালে
![]() |
| Flag of Palestine |
মোঃ রাফি, বিশ্লেষক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রাক্কালে এই ঘোষণা ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি একটি প্রতীকী সমর্থন হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে এই তিন দেশই তাদের স্বীকৃতির পাশাপাশি ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’-এর প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা ফিলিস্তিন ও ইসরাইল নামক দুটি পৃথক রাষ্ট্রের পাশাপাশি সহাবস্থানের কল্পনা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি, যদিও আন্তর্জাতিক কূটনীতির কাঠামোতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত, ফিলিস্তিনি জনগণের ঐতিহাসিক ও বর্তমান দুর্দশার প্রেক্ষাপটে একটি প্রতারণামূলক ফাঁদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন এই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান ফিলিস্তিনের ন্যায্য অধিকারের পরিপন্থী এবং কীভাবে এটি ইসরাইল নামক অবৈধ রাষ্ট্রের স্থায়ী অস্তিত্বকে বৈধতা দেওয়ার একটি গোপন ষড়যন্ত্র হিসেবে কাজ করছে।ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ফিলিস্তিনের বঞ্চনা১৯৪৮ সালে প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, যা ফিলিস্তিনিদের কাছে ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় নামে পরিচিত, প্রায় ৭৫০,০০০ ফিলিস্তিনিকে তাদের নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিল। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই বিতাড়ন এবং পরবর্তী ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিম তীর, গাজা এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করা হয়। বর্তমানে, দখলকৃত এলাকায় প্রায় ৭০০,০০০ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে (যেমন, জাতিসংঘের রেজোলিউশন ২৩৩৪) অবৈধ। এই বসতি সম্প্রসারণ ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডকে খণ্ডিত করেছে, যা একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে ক্রমশ অসম্ভব করে তুলেছে।২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানে গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ৪০,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে দুর্ভিক্ষ এবং গণহত্যার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই অপরিমেয় দুর্দশা এবং ইতিহাস জুড়ে ফিলিস্তিনিদের উপর চালানো নৃশংসতা—বিতাড়ন, গণহত্যা, অনাহার—একটি অকাট্য সত্য প্রতিষ্ঠা করে: ফিলিস্তিনি জনগণের পবিত্র ভূমিতে ইসরাইলের স্থায়ী উপস্থিতি মেনে নেওয়ার কোনো নৈতিক বা ঐতিহাসিক যুক্তি নেই।দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান: একটি প্রতারণামূলক ফাঁদদ্বি-রাষ্ট্র সমাধান, যা ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা (রেজোলিউশন ১৮১) এবং ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের পাশাপাশি সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে বাস্তবে, এই সমাধান ফিলিস্তিনের অধিকারকে সংকুচিত করেছে। বর্তমানে পশ্চিম তীরের মাত্র ৩% এলাকায় বসতি স্থাপন হলেও, এটি ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডকে এমনভাবে বিভক্ত করেছে যে একটি সংলগ্ন রাষ্ট্র গঠন প্রায় অসম্ভব। ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ এবং সাম্প্রতিক উচ্চাভিলাষী অধিগ্রহণ পরিকল্পনা (যেমন, পশ্চিম তীরের বৃহৎ অংশ সংযুক্তকরণ) দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে এই সমাধানকে “প্রায় অসম্ভব” বলে উল্লেখ করেছেন।এই প্রেক্ষাপটে, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে একটি ফাঁদ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এটি ফিলিস্তিনিদের তাদের হারানো ভূমি, বিশেষ করে পূর্ব জেরুজালেম, যা ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের পবিত্র ভূমি ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা রাখে না। বরং, এটি ইসরাইল নামক অবৈধ রাষ্ট্রকে চিরতরে পৃথিবীর বুকে বৈধতা প্রদানের একটি কৌশল। ফিলিস্তিনিরা যদি এই চুক্তিতে সম্মত হয়, তবে তারা তাদের ঐতিহাসিক অধিকার এবং ভবিষ্যতের দাবি চিরতরে হারাবে। এই সমাধান মূলত পশ্চিমা ও ইসরাইলি কূটনীতির একটি প্রতারণা, যা ফিলিস্তিনের ন্যায্য সংগ্রামকে দুর্বল করতে এবং আরব বিশ্বের কাছ থেকে ইসরাইলের জন্য নিরবচ্ছিন্ন স্বীকৃতি আদায় করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।ইসরাইলের অবৈধতা ও ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক অধিকারইসরাইল নামক কোনো রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক বা নৈতিক অস্তিত্ব নেই। ফিলিস্তিনের ভূমি, যেখানে জেরুজালেম অবস্থিত, প্রাচীন ক্যানানীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে রোমান, উমাইয়া এবং অটোমান শাসনের অধীনে ফিলিস্তিন নামে পরিচিত ছিল। এই ভূমি আরব ও মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সহস্রাব্দ ধরে টিকে আছে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা এই ভূমির সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে (৭০%) উপেক্ষা করে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে, যা আরব রাষ্ট্রগুলো প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই পরিকল্পনা ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার একটি প্রকাশ, যা ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়েছিল।জেরুজালেম, যা আল-কুদস নামে পরিচিত, ফিলিস্তিনের হৃদয়। এটি কখনোই ইসরাইলের নয়, বরং ফিলিস্তিনি জনগণের পবিত্র ভূমি। ইসরাইলের বর্তমান অস্তিত্ব, যা ৯০ লাখ জনসংখ্যা (৭৫% ইহুদি) নিয়ে গঠিত, জাতিসংঘের সদস্যপদ সত্ত্বেও একটি ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের ফল। এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ, ইন্তিফাদা থেকে বর্তমান গাজার সংগ্রাম একটি ন্যায্য ও ঐতিহাসিক দাবি।“গ্রেটার ইসরাইল” ও গোপন ষড়যন্ত্রআমার পূর্ববর্তী গবেষণামূলক নিবন্ধে (দ্রষ্টব্য: গ্রেটার ইসরায়েল প্রকল্প: ধর্মীয় আদর্শ থেকে উপনিবেশিক সম্প্রসারণ, এপ্রিল ২০২৫) আমি আলোচনা করেছি কীভাবে ধর্মীয় জায়নবাদী আদর্শ, যেমন গুশ এমুনিম বা ইয়েশা কাউন্সিলের মতো সংগঠন, “গ্রেটার ইসরাইল” প্রকল্পের মাধ্যমে নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনা করে। এই প্রকল্প বাইবেলের প্রতিশ্রুত ভূমির ধারণা (জেনেসিস ১৫:১৮-২১) এবং ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সমন্বয়। এটি পশ্চিম তীর, গাজা, জর্ডান, লেবানন এবং সিরিয়ার অংশবিশেষ দখলের পরিকল্পনা করে, যা ফিলিস্তিনি অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়ার লক্ষ্য বহন করে।এই ষড়যন্ত্রের পেছনে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে ইসরাইলকে সমর্থন করে। সাম্প্রতিক স্বীকৃতিগুলো, যদিও ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন হিসেবে উপস্থাপিত, মূলত আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে ইসরাইলের জন্য পরোক্ষ স্বীকৃতি আদায়ের একটি কৌশল হতে পারে। এই কূটনৈতিক চাল ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে দুর্বল করতে এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের মাধ্যমে ইসরাইলের স্থায়ী অস্তিত্বকে সুনিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।একটি স্থায়ী সমাধানের পথফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য একমাত্র পথ হলো একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র, যা ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের সম্পূর্ণ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত হবে। দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান ফিলিস্তিনি জনগণের ঐতিহাসিক অধিকারকে অস্বীকার করে এবং ইসরাইলের অবৈধ দখলদারিত্বকে বৈধতা দেয়। জেরুজালেম, যা ফিলিস্তিনের হৃদয়, কখনোই বিভক্ত হতে পারে না। ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে ফেরত পাওয়ার অধিকার (Right of Return), জেরুজালেমের মর্যাদা এবং বসতি অপসারণের মতো মূল বিষয়গুলো সমাধানের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাধান সম্ভব।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ইসরাইলের বিরুদ্ধে বয়কট, নিষেধাজ্ঞা এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার (BDS) আন্দোলনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ন্যায্য সংগ্রামকে সমর্থন করা। বর্তমানে, জরিপে দেখা গেছে, ৬০% ফিলিস্তিনি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে আস্থা হারিয়ে একটি একক রাষ্ট্রের পক্ষে। এই আকাঙ্ক্ষা ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক ও নৈতিক দাবির প্রতিফলন।
যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক স্বীকৃতি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটি প্রতীকী জয় হলেও, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি তাদের অঙ্গীকার ইসরাইলের অবৈধ অস্তিত্বকে বৈধতা দেওয়ার একটি গোপন ষড়যন্ত্র। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য একমাত্র পথ হলো সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, যা ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের সমগ্র ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করবে। ইসরাইল নামক কোনো রাষ্ট্র কখনো ছিল না, এবং কখনো থাকবেও না। জেরুজালেম ফিলিস্তিনের, এবং ফিলিস্তিন জনগণের।
তথ্যসূত্র
যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক স্বীকৃতি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটি প্রতীকী জয় হলেও, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি তাদের অঙ্গীকার ইসরাইলের অবৈধ অস্তিত্বকে বৈধতা দেওয়ার একটি গোপন ষড়যন্ত্র। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য একমাত্র পথ হলো সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, যা ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের সমগ্র ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করবে। ইসরাইল নামক কোনো রাষ্ট্র কখনো ছিল না, এবং কখনো থাকবেও না। জেরুজালেম ফিলিস্তিনের, এবং ফিলিস্তিন জনগণের।
তথ্যসূত্র
- জাতিসংঘ, “প্যালেস্টাইন প্রশ্ন” (UNISPAL)
- গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ২০২৩-২৫ তথ্য
- “গ্রেটার ইসরাইল প্রজেক্ট”, এপ্রিল ২০২৫
- প্যালেস্টাইন সেন্টার ফর পাবলিক ওপিনিয়ন, ২০২৫ সার্ভে

Comments
Post a Comment